অন্যদিকে, বাংলাদেশের মানুষের জন্য ২০২৬ সাল কেবল একটি নতুন বর্ষবরণ নয় বরং এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার নাম। কারণ, দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
চলুন, একনজরে ফিরে দেখা যাক ২০২৫ সালের সেই ঘটনাবহুল দিনলিপি।
জানুয়ারি : সংস্কারের রোডম্যাপ ও নতুন বাংলাদেশের সূচনা
সংস্কারের অঙ্গীকার :১৭ জানুয়ারি জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ বাস্তবায়নের শপথ পুনর্ব্যক্ত করেন। পুলিশ, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার কমিশনগুলো মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করে।

ঐতিহাসিক রায় ও মুক্তি : ১৫ জানুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার সাজা বাতিল করেন উচ্চ আদালত। পরদিন ১৬ জানুয়ারি দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছর পর কারামুক্ত হন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর।
ক্যাম্পাস ও রাজপথ : সাত কলেজের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা। মাসের শেষে রানিং স্টাফদের ধর্মঘটে স্থবির হয়ে পড়ে দেশের রেলযোগাযোগ।
ফেব্রুয়ারি : কূটনৈতিক তৎপরতা ও ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’
নিরাপত্তা অভিযান : অপরাধ দমনে গত ৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’। প্রথম দিনেই সহস্রাধিক গ্রেপ্তার দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
কূটনৈতিক টানাপড়েন : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য ও উসকানিমূলক তৎপরতার অভিযোগে ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ জুলাই বিপ্লবের ওপর ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ আলামত সম্বলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি : ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’।
মার্চ-এপ্রিল : উত্তপ্ত হয় দ্রব্যমূল্যের বাজার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। আর রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণই ছিল সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
চুক্তি পুনর্বিবেচনা : আদানি গ্রুপসহ বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠিত হয়।
আইনি পরিবর্তন : বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫’ প্রবর্তিত হয়।
বিনিয়োগ ও কূটনীতি : এপ্রিলে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট’-এ ৫০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের শীতল সম্পর্ক কাটিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে শুরু হয় উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠক।
মে : খালেদা জিয়ার প্রত্যাবর্তন
আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত : ১২ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে জুলাই-আগস্ট গণহত্যার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নিবন্ধন স্থগিত করা হয়।
খালেদা জিয়ার ফিরে আসা : দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৬ মে লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

মব ভায়োলেন্স ও দুর্যোগ : একই মাসেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির মতো ঘটনা উদ্বেগ সৃষ্টি করে। মাসের শেষে ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে।
জুন-জুলাই : বাজেট ও আকাশপথে ট্র্যাজেডি
গত ২ জুন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট পেশ করেন। তবে, জুলাই মাসে ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের ওপর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তে ৩২ জনের মৃত্যু জাতিকে শোকাতুর করে তোলে। সেই সঙ্গে ২৪ জুলাই গ্রেপ্তার হন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ. বি. এম. খায়রুল হক।

আগস্ট-সেপ্টেম্বর : অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে ‘জুলাই বিপ্লব দিবস’ পালিত হয়।
অক্টোবর-নভেম্বর : রায় ও নির্বাচনের সানাই
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায়ে (অনুপস্থিতিতে) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সংবিধানে ফিরে আসে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা। আর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দীর্ঘক্ষণ বিমান চলাচল বন্ধ থাকে।

ডিসেম্বর : এক নক্ষত্রের বিদায় ও শোকার্ত সমাপ্তি
বছরের শেষ মাসটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বেদনাবিধুর। এই মাসের ১১ তারিখ নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে বহু প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। তফসিল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন নির্ধারিত হয়।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড : পল্টনে তরুণ নেতা ওসমান হাদির ওপর নৃশংস হামলা ও ১৮ ডিসেম্বর তার শাহাদাত বরণ পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয়।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন : দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান।

খালেদা জিয়ার প্রয়াণ : বছরের শেষলগ্নে ইন্তেকাল করেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ৩১ ডিসেম্বর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ জিয়ার কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়।
২০২৬ সাল : যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে
২০২৫ সালকে বিদায় জানিয়ে ২০২৬ সালে পা রাখল বাংলাদেশ। নতুন বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হলো একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা। আর রাজনৈতিক সমঝোতা বজায় রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে রাখাই হবে নতুন সরকারের ও প্রশাসনের জন্য কঠিনতম পরীক্ষা।

সংসদ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ
গণভোট ও জুলাই চার্টার : নির্বাচনের দিনই জুলাই চার্টার বা জুলাই ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন (যেমন—দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা) নিয়ে গণভোট হবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে।
Leave a Reply