জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এখন থেকে কেবল বিপিসি বা রিফাইনারির ওপর নির্ভর না করে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিজস্ব ডিপো ব্যবহার করে তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এই উদ্যোগের ফলে নিয়মিত আমদানির অতিরিক্ত জ্বালানি মজুতের মাধ্যমে আপৎকালীন সময়ে কেন্দ্রগুলো সচল রাখা এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সম্প্রতি পিডিবিসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠক করেছে মন্ত্রণালয়। বৈঠকে তাদের চাহিদা ও মজুত সক্ষমতার সার্বিক হিসাব চাওয়া হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও ইস্টার্ন রিফাইনারির যৌথভাবে ১৫ লাখ টন জ্বালানি তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। এ পরিমাণ মজুত দিয়ে ৪৫ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। সরকার এ মজুত সক্ষমতা বাড়িয়ে ৬০ দিনের বেশি করতে চায়।
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক চিত্রে দেখা যায়, বিপিসির অধীন তিন প্রধান প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পদ্মা অয়েলের সক্ষমতা ৩.৮ লাখ টন, মেঘনা অয়েলের ২.৪৬ লাখ টন এবং যমুনা অয়েলের ২.২৭ লাখ টন। এছাড়া ইস্টার্ন রিফাইনারির নিজস্ব মজুত সক্ষমতা ৫ লাখ ২ হাজার ২৯০ টন এবং স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল লিমিটেডের (এসএওসিএল) ১৬ হাজার টনের একটি মজুতাগার আছে। এর বাইরে বিভিন্ন ছোট ডিপো ও ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টে অতিরিক্ত মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্ল্যান্টগুলো দৈনিক ৭০০ টন তেল সরবরাহ করতে সক্ষম।
জ্বালানি তেলের এ মজুত সক্ষমতা মূলত বিপণন ও বিতরণের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বা কৌশলগত মজুত ব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট তৈরি হলে দেশ প্রায়ই বিপাকে পড়ে। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৩০ ডলারের নিচে নেমে এলে তৎকালীন সরকার কম দামে তেল কিনে ৬০ দিনের মজুত গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে গত ছয় বছরেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং এর অধীন পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার চিত্রে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারিভাবে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৪৭টি ও ডিজেলভিত্তিক ৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। যদিও ব্যয়বহুল হওয়ায় পিডিবির আওতাধীন ডিজেলভিত্তিক ২২২ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় না।
তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জন্য ফার্নেস অয়েল আমদানি করে থাকে বিপিসি, যা পিডিবির মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। এসব কেন্দ্রের প্রত্যেকেটিরই তেল মজুত রাখার জন্য নিজস্ব ডিপো থাকে। তেলচালিত সবচেয়ে বেশি বিদুৎকেন্দ্র রয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের অধীনে (আইপিপি)। তাদের ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। আর সরকারি পর্যায়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা রয়েছে পিডিবি, বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেড, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ও নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের।
তথ্যমতে, বি-আর পাওয়ারজেনের তেলের মোট মজুত সক্ষমতা ২০ হাজার মেট্রিক টন। অপরদিকে রুরাল পাওয়ার কোম্পানির মজুত সক্ষমতা ১৬ হাজার মেট্রিক টন। আর পিডিবির অধীনে সরকারি ও বেসরকারি ৫১ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফার্নেস অয়েল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯২৬ মেট্রিক টন। ডিজেল মজুতের সক্ষমতা রয়েছে ৮২ হাজার ৬৮৮ মেট্রিক টিন। অর্থাৎ সার্বিকভাবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্টোরেজ ব্যবহার করলে সরকারের মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৬১৪ মেট্রিক টন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির আওতায় সরকার প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিপো ব্যবহার করবে। অর্থাৎ সরকার রেগুলার আমদানির পরিমাণের চাইতে বেশি তেল আমদানি করে ৩ মাসের সমপরিমাণ তেল কেন্দ্রগুলোর ডিপোতে সরবরাহ করে দেবে। এতে একদিকে যেমন আপৎকালীন সময়ে কেন্দ্রগুলো তেল সংকটে ভুগবে না, তেমনি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা?
জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির এই পরিকল্পনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা।
বি-আর পাওয়ারজেন লিমিটেডের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ ইতিবাচক। জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করেছি। এই উদ্যোগের ফলে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে তেলের অভাবে ভুগতে হবে না, ফলে লোডশেডিং পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।
রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) রেজাউল কবীর বলেন, সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রগুলোর ডিপো পরিপূর্ণ থাকা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখবে।
বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) প্রেসিডেন্ট ডেভিড হাসনাত। তিনি বলেন, সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটাই দেখার বিষয়। পিডিবির কাছে আমাদের বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের প্রচুর বকেয়া জমে আছে, যা আমরা পাচ্ছি না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বদরুল ইমাম বলেন, এভাবে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি (মজুত সক্ষমতা) বৃদ্ধির পরিকল্পনাটি ভালো। যদিও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া পাওনার বিষয়টি একটি বড় ইস্যু। তবে যেহেতু সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তাই যেভাবেই হোক এটি বাস্তবায়ন করতে হবে।
Leave a Reply